, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
নির্বাচন

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন: পিআর পদ্ধতি না প্রচলিত ব্যবস্থা?

  • আপলোড সময় : ০৬-০৭-২০২৫ ০৪:১৩:২৫ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৬-০৭-২০২৫ ০৪:১৩:২৫ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন: পিআর পদ্ধতি না প্রচলিত ব্যবস্থা? বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ।
 
বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে নির্বাচন পদ্ধতি। বর্তমানে প্রচলিত 'ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট' (FPTP) পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে অনেক রাজনৈতিক দল সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন বা ‘প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন’ (PR) পদ্ধতি চালুর দাবি তুলছে। অন্যদিকে এই পদ্ধতির বিরোধিতাও করছেন কিছু শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। ফলে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
 
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের রায় যথাযথভাবে প্রতিফলন। কিন্তু প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতিতে একজন প্রার্থী মোট ভোটের একটি নির্দিষ্ট অংশ পেলেই নির্বাচিত হন। ফলে ভোটের বড় একটি অংশ কার্যত অপ্রতিনিধিত্বশীল থেকে যায়। এই বৈষম্য থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বিশ্বের অনেক দেশ সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এই পদ্ধতিতে একটি দল যত শতাংশ ভোট পায়, তত শতাংশ আসন পায় সংসদে।
 
১৯৮৯ সালে প্রথম বেলজিয়ামে পিআর পদ্ধতি চালু হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে ৯১টি, অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ দেশ এ পদ্ধতি অনুসরণ করে। উন্নত দেশগুলোর সংগঠন ও-ই-সি-ডি’র মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টি এই পদ্ধতির আওতায় নির্বাচন পরিচালনা করে।
 
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিগত জাতীয় নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, PR পদ্ধতি চালু থাকলে নির্বাচনী ফলাফল অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য হতে পারত। যেমন ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৪০.৮৬ শতাংশ ভোট পেয়ে পেয়েছিল ১৯৩টি আসন, অপরদিকে আওয়ামী লীগ ৪০.২২ শতাংশ ভোট পেয়েও পেয়েছিল মাত্র ৬২টি আসন। একইভাবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৮.০৪ শতাংশ ভোট পেয়ে পেয়েছিল ২৩০টি আসন, অথচ বিএনপি ৩২.৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৩০টি আসন পায়।
 
এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কিছু রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জামায়াতে ইসলামি, এনসিপি, এবি পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিআর পদ্ধতির দাবি জানিয়ে আসছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এক মহাসমাবেশে তারা একত্রে এই দাবি তোলেন এবং বলেন, দেশের বাস্তবতায় এই পদ্ধতির বিকল্প নেই।
 
ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, এই পদ্ধতি চালু হলে কোনো দল এককভাবে ক্ষমতা দখল করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কায়েম করতে পারবে না। জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও বলেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি ছাড়া বাংলার মানুষ কোনো নির্বাচন গ্রহণ করবে না।
 
অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলো পিআর পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, পিআর পদ্ধতি দেশে ঐক্যের পরিবর্তে বিভক্তি সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, দেশের বাস্তবতায় এই পদ্ধতিতে নির্বাচন আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে ভেবে দেখা দরকার।
 
এই বিতর্কের মধ্যেই নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য সময় ও আইনি কাঠামো প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমীন টুলী বলেন, পিআর পদ্ধতিতে ভোট হলে অতীতের মতো এককভাবে সরকার পরিচালনার সুযোগ কমে আসবে। কারণ সরকার গঠনে বড় দলগুলোকে ছোট দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে। তবে তিনি এটাও বলেন, আগামী নির্বাচনের আগেই এই পদ্ধতি কার্যকর করা সম্ভব নয়। কারণ প্রস্তাবনা, আইন প্রণয়ন, রাজনৈতিক সমঝোতা ও প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন হবে আরও সময়।
 
তিনি আরও বলেন, পিআর পদ্ধতি চালু হলে প্রতিটি দলের প্রার্থী তালিকা আগেই নির্বাচন কমিশনে জমা দেবে। পরে ভোট অনুযায়ী নির্ধারিত আসন পেয়ে সেই তালিকা অনুযায়ী সংসদ সদস্য মনোনীত হবে।
 
তবে অনেক রাজনৈতিক নেতা এই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ ও জটিল বলে মনে করছেন। বিশেষ করে বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না থাকলে এ ধরনের বড় পরিবর্তন কার্যকর করা কঠিন হবে।
 
সবশেষে বলা যায়, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে দেশে রাজনৈতিক আলোচনার নতুন দ্বার খুলেছে। তবে এ নিয়ে মতপার্থক্য এখনো তীব্র, এবং আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা কঠিন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
 
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিজস্ব প্রতিবেদক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
​বিশ্বকাপ নাটকে নতুন মোড়, টি-২০ বিশ্বকাপে এখনো  বাংলাদেশের সুযোগ!

​বিশ্বকাপ নাটকে নতুন মোড়, টি-২০ বিশ্বকাপে এখনো বাংলাদেশের সুযোগ!